হাওজা নিউজ এজেন্সি‘কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মাসুমেহ গোলামআলিপুর বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ব্যাপক প্রসারের ফলে বিপুল পরিমাণ তথ্য—সত্য ও মিথ্যা উভয়ই—অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে পরিবারগুলোর কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। এর সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে শিশু ও কিশোরদের ওপর।
তিনি বলেন, এসব তথ্য কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই ছাড়াই পারিবারিক পরিমণ্ডলে প্রবেশ করছে এবং পরিবারের সদস্যদের চিন্তা, বিশ্বাস ও দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করছে। ফলে তথ্য-সচেতনতা ও গণমাধ্যম-সাক্ষরতার বিষয়টি এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তার মতে, এ ক্ষেত্রে পরিবার, বিশেষ করে মায়েরাই প্রথম সারিতে রয়েছেন। কারণ, একদিকে তাদের ওপর পরিবারের সদস্যদের মানসিক ও চিন্তাগত সুরক্ষার দায়িত্ব রয়েছে, অন্যদিকে সন্তানদের তথ্য ও সংবাদ গ্রহণের সঠিক পদ্ধতি শেখানোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও তারা পালন করেন। এ বিষয়ে অবহেলা শিশু-কিশোরদের মানসিক বিকাশ ও ব্যক্তিত্ব গঠনে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তিনি বলেন, মায়েরা সন্তান ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ও আবেগপূর্ণ সম্পর্কের কারণে সংবাদ ও তথ্য বিশ্লেষণের প্রথম নির্ভরযোগ্য পথপ্রদর্শক হতে পারেন। যাচাই ছাড়া কোনো তথ্য গ্রহণ না করার মানসিকতা গড়ে তুলতে পরিবারকে উৎসাহিত করাও তাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
তিনি আরও বলেন, একজন মা তার সন্তানকে শেখাতে পারেন কীভাবে কোনো তথ্যের উৎস শনাক্ত করতে হয় এবং তার সত্যতা যাচাই করতে হয়। এমনকি কোনো সংবাদ, ছবি বা ভিডিও নিয়ে পরিবারের মধ্যে সাধারণ আলোচনা শিশু-কিশোরদের মধ্যে সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি ও সত্য অনুসন্ধানের মনোভাব গড়ে তুলতে সহায়তা করে। এর ফলে তারা গুজব, বিভ্রান্তিকর প্রচারণা ও অপতথ্যের প্রভাব থেকে নিজেদের রক্ষা করতে সক্ষম হয়।
খোরাসান হাওজায়ে ইলমিয়ার এই পরামর্শক বলেন, গণমাধ্যম-সাক্ষরতা শিক্ষার প্রথম ধাপ হলো মায়েদের নিজেদের এ বিষয়ে দক্ষ হয়ে ওঠা। তাদের জানতে হবে কোন উৎস নির্ভরযোগ্য এবং কোন তথ্য গুজব বা বিভ্রান্তিকর। এরপর এই জ্ঞান সরাসরি উপদেশের মাধ্যমে নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে সন্তানদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।
তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, কোনো সংবাদ দেখার পর একজন মা যদি সেটি যাচাই ও বিশ্লেষণের প্রক্রিয়াটি সন্তানদের সামনে ব্যাখ্যা করেন, তাহলে শিশুরা ধীরে ধীরে সেই পদ্ধতি রপ্ত করতে শিখবে।
জনাবা গোলামআলিপুর আরও বলেন, সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সন্তানদের সঙ্গে আলোচনা করা এবং তাদেরকে কেবল শোনা কথা পুনরাবৃত্তি না করে যুক্তি ও প্রমাণের ভিত্তিতে মতামত দিতে উৎসাহিত করা বিশ্লেষণী চিন্তাশক্তি বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তিনি কিশোর-কিশোরীদের আবেগ-অনুভূতির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন। তার ভাষায়, গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশু ও কিশোরের আবেগ যথাযথভাবে পরিচালিত হয় না অথবা যাদের জীবনে সুস্পষ্ট লক্ষ্যবোধ নেই, তারা সহজেই বিভিন্ন বাহ্যিক প্রভাব, উত্তেজনামূলক বিনোদন কিংবা বিভ্রান্তিকর প্রবণতার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, যদি মায়েরা সন্তানদের চিন্তাশীল, বিশ্লেষণক্ষম ও সত্যঅনুসন্ধানী হিসেবে গড়ে তুলতে পারেন, তাহলে ভবিষ্যতে তারা তথ্যপ্রবাহ ও প্রচারণার নানা ঢেউয়ের মুখেও দৃঢ় থাকতে পারবে এবং আরও বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম হবে।
শেষে তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সচেতন শিক্ষা, পারিবারিক সংলাপ, নিরাপদ ও আস্থাপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি, আবেগের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং মায়েদের আদর্শ আচরণ ও জীবনচর্চাই পরিবারের মানসিক স্থিতি ও সচেতনতা রক্ষার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
সূত্র: হাওজা নিউজ।
আপনার কমেন্ট